
মেটার তৈরি ‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে রাস্তায় অপরিচিত নারীদের অজান্তে ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমন ঘটনায় জনসমক্ষে নারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভারতে এমনই একটি ঘটনার পর মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
কথোপকথনের আড়ালে গোপনে ভিডিও ধারণ
ভারতের কলকাতার ৩৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ইয়ামিনি গত জুনের এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিলেন। রাত সোয়া ৮টার দিকে কিছুটা নির্জন একটি এলাকায় হঠাৎ এক অপরিচিত ব্যক্তি তাকে থামান।
লোকটি ইয়ামিনিকে জানান, দূর থেকে দেখে তাকে ‘কিউট’ মনে হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত শেষ করার জন্য ইয়ামিনি ভদ্রভাবে উত্তর দিয়ে সেখান থেকে চলে যান।
তখনও তিনি জানতেন না, ওই ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে তাদের কথোপকথনের পুরো ঘটনাটি গোপনে ভিডিও ধারণ করছিলেন।
পরদিন একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ইয়ামিনি জানতে পারেন, ওই ভিডিও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা হয়েছে।
ভিডিওটির নির্মাতা নিজেকে ‘পিক-আপ আর্টিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাস্তায় নারীদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, তার উদাহরণ হিসেবে ইয়ামিনির সঙ্গে হওয়া কথোপকথনটি উপস্থাপন করেন।
প্রকাশের পর ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে এটি ২৩ লাখের বেশি মানুষ দেখেন।
ভিডিওটি দেখার পর আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ইয়ামিনি। কারণ ভিডিওতে তিনি দেখতে পান, ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলার আগে কিছু সময় তাকে অনুসরণ করেছিলেন।
ভিডিওটি দেখার পরই ইয়ামিনির কাছে স্পষ্ট হয়, ঘটনাটি কেবল রাস্তায় ঘটে যাওয়া আকস্মিক একটি কথোপকথন ছিল না।
যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের অভিযোগ
এ ধরনের ঘটনা শুধু ভারতেই ঘটেছে এমন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
চলতি বছর ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ শিক্ষার্থী ইসোবেল থম্পসন অভিযোগ করেন, একজন ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা দিয়ে তাকে ধারণ করেছিলেন এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন।
ঘটনাটিতে তিনি আতঙ্কিত বোধ করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন।
মেটাকে আইনি নোটিশ
ইয়ামিনির পক্ষে ভারতের ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন বা আইএফএফ মেটাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে।
নোটিশে ভিডিওটির সব কপি সরিয়ে ফেলা, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইসের তথ্য প্রকাশ, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।
গোপনীয়তা সুরক্ষায় মেটার ব্যাখ্যা
মেটার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের স্মার্ট চশমায় গোপনীয়তা সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। চশমা দিয়ে ভিডিও ধারণের সময় একটি এলইডি বাতি জ্বলে ওঠে, যা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, কেউ যদি ওই বাতিটি ঢেকে দেন, তাহলে চশমাটির ক্যামেরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
তবে ইয়ামিনির বক্তব্য ভিন্ন। তিনি জানান, ওই ব্যক্তির চশমায় তিনি কোনো রেকর্ডিং লাইট দেখতে পাননি।
সাধারণ দেখতে একটি চশমার মধ্যে ক্যামেরা থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনাও তার মাথায় আসেনি বলে জানান তিনি।
গোপনে ধারণ করা ‘পিক-আপ’ ভিডিও সরানোর উদ্যোগ
গত জুলাইয়ে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি জানিয়েছিলেন, অপরিচিত মানুষকে হয়রানির উদ্দেশ্যে তৈরি ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ‘পিক-আপ লাইন’ ধরনের গোপনে ধারণ করা ভিডিও সরানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
মেটার নীতিমালাতেও হয়রানি এবং কাউকে যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণভাবে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
পুলিশের কাছে অভিযোগ, বদলে গেছে ইয়ামিনির দৃষ্টিভঙ্গি
ইয়ামিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর পর অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া ও স্টকিংসহ কয়েকটি ধারায় মামলা হয়েছে।
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েছে মানুষের প্রতি তার বিশ্বাসের জায়গায়। এখন রাস্তায় কোনো অপরিচিত ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে এলেই তিনি সন্দেহ করেন, তাকে গোপনে ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে কি না।
ইয়ামিনির মতে, কেউ যদি মোবাইল ফোন দিয়ে প্রকাশ্যে তার ভিডিও ধারণ করেন, তাহলে অন্তত আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ থাকে না।
এ কারণে নিজের ছবি এবং ব্যক্তিগত মুহূর্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার মতো অনুভূতি তৈরি হয় বলে জানান তিনি।
মেটা জানিয়েছে, ইয়ামিনিকে নিয়ে তৈরি ভিডিওটি পরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে স্মার্ট চশমার গোপনীয়তা সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজ তারা অব্যাহত রাখবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।