
পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের পাহারাদার নয়, বরং জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রের সেবক এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, পুলিশের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের সেবা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নির্বাচনকালীন দায়িত্ব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসন অনেকাংশে মাঠপর্যায়ের পুলিশের আচরণের ওপর নির্ভরশীল। কেবল শক্তি প্রয়োগ করে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়; জনগণের আস্থা অর্জন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের জন্য পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে নিরাপদ করতে প্রায় এক লাখ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশকে শতভাগ নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা বা আপ্যায়ন গ্রহণ করা যাবে না। ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
আইন প্রয়োগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, পুলিশের প্রকৃত শক্তি কঠোরতায় নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। তদন্ত, গ্রেপ্তার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশকে হতে হবে নিরপেক্ষ ও বিচক্ষণ। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না। জনগণ এমন পুলিশ বাহিনী প্রত্যাশা করে, যারা ভয় সৃষ্টি নয় নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলবে।
দুর্নীতিকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে এবং জনগণের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। কোনো পুলিশ সদস্য যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য দায়িত্বচ্যুত হয়, তবে তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। অন্যায় আদেশ বা পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
সাহসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সাহস শুধু বিপদের মুখে দাঁড়ানো নয়; অন্যায় আদেশে ‘না’ বলা এবং জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত সাহস। নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত সততা ও নৈতিকতা।
তিনি বলেন, কর্মজীবনে নানা চাপ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে সততা ও দেশপ্রেম থাকলে কোনো কিছুই দায়িত্ব পালনে বাধা হতে পারে না। “আপনারা শুধু আজকের পুলিশ নন, আপনারাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পুলিশ”—এ কথা উল্লেখ করে তিনি দুর্নীতি ও পক্ষপাতমুক্ত, মানবিক ও সাহসী একটি গৌরবময় পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. তওফিক মাহবুব চৌধুরী।
২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ৪১তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের ৯৬ জন প্রশিক্ষণার্থী এদিন কুচকাওয়াজের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কুচকাওয়াজে ৪১তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের ৮৭ জনের পাশাপাশি ২৮তম বিসিএসের একজন, ৩৫তম বিসিএসের তিনজন, ৩৬তম বিসিএসের একজন, ৩৭তম বিসিএসের দুজন এবং ৪০তম বিসিএসের দুজন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেন।
প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ধীমান কুমার মন্ডল। সামগ্রিক কৃতিত্বের জন্য বেস্ট প্রবেশনার নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড পান মো. মেহেদী আরিফ, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন মো. সজীব হোসেন, বেস্ট হর্সম্যানশিপ অ্যাওয়ার্ড পান মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ এবং বেস্ট শুটার নির্বাচিত হন সালমান ফারুক। প্রশিক্ষণ শেষে নবীন সহকারী পুলিশ সুপারদের দেশের বিভিন্ন জেলায় ছয় মাসের বাস্তব প্রশিক্ষণে পদায়ন করা হবে।