
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের পরিচিত রক গিটারিস্ট চংথাম বিক্রম সিংয়ের হত্যাকাণ্ড ঘিরে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। ৫৪ বছর বয়সী এই সংগীতশিল্পী দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লিতে নিজের বাসার বাইরে হামলার শিকার হয়ে মারা যান। তাঁর মরদেহ মণিপুরে পৌঁছানোর পর পুরোনো বন্ধু ধীরেন সাদোকপাম বিমানবন্দরে তাঁকে গ্রহণ করতে যান।
বাড়ির বাইরে আপত্তি জানিয়েছিলেন বিক্রম
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ সেপ্টেম্বর রাতে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের বাইরে একদল ব্যক্তি উচ্চস্বরে চিৎকার করছিলেন এবং মদ্যপান করছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বিক্রম আপত্তি জানালে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলার পর বিক্রম বাসায় ফিরে গেলেও অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তাঁকে অনুসরণ করে ফ্ল্যাটের বাইরে আবারও মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁর তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন ২০ বছর বয়সী ছেলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ভোরে ওই হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় সাতজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ও এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
উত্তর-পূর্বের জনগোষ্ঠীর ওপর বৈষম্যের অভিযোগ সামনে
বিক্রমের মৃত্যুর পর দিল্লিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বর্ণবাদী অপমান, হয়রানি ও সহিংসতার অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে।
তবে এখন পর্যন্ত হত্যার ঘটনায় জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায়নি পুলিশ। এর মধ্যেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ করেছে এবং ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
বিক্রমের স্ত্রী জোশনা চংথাম বলেছেন, ‘আমরা প্রতিশোধ চাই না, আমরা বিচার চাই। তাঁর একটি পরিচয়, পরিবার ও গুরুত্বপূর্ণ জীবন ছিল।’
মায়ের হাত ধরে সংগীতে বিক্রমের পথচলা
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিক্রম। তাঁর মা চংথাম কমলা ছিলেন একজন খ্যাতিমান গায়িকা। তিনি মণিপুরি ভাষায় নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাতামগি মণিপুর’-এর কণ্ঠশিল্পীও ছিলেন।
শৈশবে মায়ের সঙ্গে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যেতেন বিক্রম। পরবর্তী সময়ে শিশুশিল্পী হিসেবে নিজেও সেখানে অ্যাকর্ডিয়ন বাজিয়েছেন তিনি।
কৈশোরে এসে হাওয়াইয়ান ও স্প্যানিশ গিটারের পাশাপাশি ইলেকট্রিক গিটারেও হাতেখড়ি নেন বিক্রম। ১৯৮০-এর দশকে ইম্ফলে ক্যাসেটের মাধ্যমে হার্ড রক ও হেভি মেটালের সংগীত ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি স্থানীয় ব্যান্ড আলট্রা ভাইরেস, ফোনিক্স ও ইস্টার্ন ডার্কের সঙ্গে যুক্ত হন।
মণিপুরে নিজস্ব রকসংগীতের ধারার বিকাশে বিক্রমের প্রজন্মের শিল্পীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
রক থেকে জ্যাজ, ব্লুজ ও ফিউশনে
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে কলকাতার একটি সংগীত বিদ্যালয়ে দুই বছর কাটান বিক্রম। ওই সময় জ্যাজ ও ধ্রুপদি সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
পরে রক, ব্লুজ, জ্যাজ ও ফিউশনসহ বিভিন্ন সংগীতধারাকে নিজের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে মিলিয়ে আলাদা একটি সংগীতভাষা তৈরি করেন তিনি।
২০০০-এর দশকে দিল্লিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর সংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি শিক্ষাদানের সঙ্গেও যুক্ত হন বিক্রম।
২০১০ সালে গড়ে তোলেন Fubar Ghetto
পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ২০১০ সালে Fubar Ghetto নামে একটি ব্যান্ড গড়ে তোলেন বিক্রম। ব্যান্ডটি দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন ক্লাব ও সাংস্কৃতিক উৎসবে সংগীত পরিবেশন করেছে।
এ ছাড়া ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা এবং চেক দূতাবাসেও সংগীত পরিবেশন করেছে দলটি।
বিক্রম বড় কোনো তারকা হয়ে ওঠেননি। কিন্তু তাঁর শিক্ষার্থী, সহশিল্পী ও বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন উদার, বিনয়ী এবং অনুপ্রেরণাদায়ী একজন মানুষ।
বন্ধুর শেষ স্মৃতিতে গিটার আর শিক্ষার্থীদের গল্প
বিক্রমের পুরোনো বন্ধু ধীরেন সাদোকপামের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৯ সালে দিল্লিতে। সেই সাক্ষাতে বিক্রম গিটার বাজিয়েছিলেন। পাশাপাশি নিজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নানা কথা বলেছিলেন এবং বন্ধুকে আবার দিল্লিতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
শিগগিরই আবার দেখা করতে যাবেন—এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন সাদোকপাম।
কিন্তু বন্ধুর সেই প্রতিশ্রুতি আর পূরণ হয়নি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমি আর ফিরে যেতে পারিনি।’